অপারেশন মাইনোরিটি – সংখ্যালঘু নির্যাতনে কার কী অবদান : ১

April 7, 2014 in Vested properties


আসুন বর্তমান অবস্থা স্বীকার করি। ভালো মানুষের জন্য কারাগার, সুস্থদের জন্য সিএমএইচ, বাকিদের জন্য সংসদ। মহামতি লেনিন বলেছেন, ‘সংসদ হচ্ছে শুয়োরের খোয়াড়।’ সমাজতন্ত্রের অভিভাবকেরা গণতন্ত্র ঘৃণা করতেন সঙ্গত কারণেই। ভাত চুরির চেয়ে ভোটাধিকার চুরি অধিকতর অপরাধ। আর ভোটারবিহীন নির্বাচনের কারণে তিন মুণ্ডুর যে মহাতাণ্ডব, সে কোড ভাঙতেই লেখাটি। 

যুগে যুগে দানব এসেছে ভিন্ন ভিন্নরূপে। কখনো নিক্সনের ‘অপারেশন ব্রেকফাস্ট’, কখনো বুশের ‘ডেজার্ট স্টর্ম’, আবার পাকিস্তানিদের ‘অপারেশন সার্চলাইট’…। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের মতো দুই দানবের সত্য-মিথ্যা আমলে নেয়ার পরেই শুধু নাম দিলাম- ‘অপারেশন মাইনোরিটি’। একটি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ধরে রাখার জন্য সংখ্যালঘু কার্ডটি লাইফ সাপোর্টের মতো জরুরি কেন, বোঝার জন্য আইনস্টাইন হওয়ার দরকার নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে প্রমাণ হয়, হিন্দুদের কোনো শত্র“ লাগে না, কারণ এরা এদের তিন শত্র“ অর্থাৎ ‘ভারতপ্রীতি, আওয়ামী নির্ভরতা, মেরুদণ্ডের অভাব’, একটিও বুঝতে অম। ইতিহাস সাক্ষী, তিন শত্রুই এই ভূখণ্ডে তাদের টিকে থাকার প্রধান অন্তরায়। নিজেদের ওপর ন্যূনতম বিশ্বাসটুকু পর্যন্ত নেই। যত দিন না ৬৭ বছর বয়েসী নাবালকেরা মায়ের আঁচল ছেড়ে সাবালক হবে, তত দিন পর্যন্ত সংখ্যালঘু অসুখের জন্য দায়ী থাকবে মূলত নিজেরাই।

এই দাগে ভারতের হস্তপে এমন পর্যায়ে, আওয়ামী লীগ আরো ২৫ বছর মতায় না থাকলে এত বড় ঔপনিবেশিক কার্যক্রম কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। এ জন্য সংখ্যালঘুরা কী মাশুল দিচ্ছে, পরোয়া করে না দিল্লি। অতীতেও করেনি নেহরু এবং তার কন্যা। ইতিহাস সাক্ষী, মাউন্টব্যাটেনের সাথে নেহরুর গোপন মুসাবিদার কারণেই দেশ বিভাগের এই ছিড়ি। এই বাংলাকে কাটতে কাটতে আর কত ছোট করা যায়, পরিকল্পনা নেহরুর। ওদের তাণ্ডবেই সংখ্যালঘু অসুখটি বারবারই এই ভূখণ্ডে মাথাচাড়া দিয়েছে, যার কুফল বারবার ভোগ করছে সংখ্যালঘুরা; কিন্তু দেশ বিভাগের প্রতিশোধ ওদের এজেন্ডা হলেও সাধারণ মানুষের অপরাধ কী? সুতরাং ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে নির্যাতন না ঢাকা-দিল্লির যৌথ অপারেশন, আর একটি গুলিও চালানোর আগে ট্রুথ কমিশন গঠন করে সত্য উদঘাটন জরুরি, অন্যথায় আন্দোলনের বিকল্প নেই।

যা-তা কাণ্ড। এক দিকে জঙ্গিবাদের কাল্পনিক বোমা নিয়ে খেলছে সরকার, অন্য দিকে বিশেষ গোষ্ঠীকে টার্গেট করে দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে ভারত। কোনোরকম তদন্ত ছাড়াই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অপরাধে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বুকে গুলি চালিয়ে প্রকাশ্যেই ভারতকে সন্তুষ্ট করছে এরা। এতে কি সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ কমবে? ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কমবে না। বিরোধী দলের অভিযোগ, অপরাধীদের না ধরে বরং বিরোধী দলের ওপর ‘সিলেক্টিভ কিলিং’ করছে সরকার। ক্রসফায়ারে এই পর্যায়ের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জাতিসঙ্ঘের সনদ অনুযায়ী গণহত্যার শামিল। তাহলে জাতি হিসেবে আমরা কি ‘অবিচারের’ কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি? মানবাধিকার নেতা ড. কিং বলেছেন, ‘অবিচারের একটি আঘাত মানেই সুবিচারের বিরুদ্ধে সর্বত্রই আঘাত।’ সাম্প্রতিক ঘটনায় ড. মিজান আর সুলতানা কামালদের মতো মানবাধিকার ব্যবসায়ীদের মুখে ‘ওয়াজ’ শোনা আর অন্ধের চোখে চশমা পরা এক। সংখ্যালঘু পসরা সাজিয়ে বিশ্রী মায়াকান্না আর সহ্য হচ্ছে না। অপদার্থদের কারণেই রাজনীতি যেন কচিকাঁচার আসর। তবে সংখ্যালঘুদের জড়িয়ে নির্বাচনের বস্ত্রহরণে জাতির সতীত্ব চরম বিপাকে।

ড. কিং বলেছেন, ‘একজন কৃষ্ণাঙ্গের ওপর আক্রমণ মানেই পুরো ‘কৃষ্ণাঙ্গ জাতির’ ওপর আক্রমণ।’ যা লিখছি, ইতিহাস ছুঁতেই হবে। সংখ্যালঘুদের আমি সেই ১ পার্সেন্ট, যাদের ভাণ্ডারে ত্র“টিপূর্ণ দেশ বিভাগ এবং সংখ্যালঘু অসুখের বিচিত্র খবর। সেই আলোকে প্রশ্ন, বৌদ্ধবিহার ও মালোপাড়ায় আক্রমণকারীদের পরিচয় কী? তদন্ত ছাড়া কিসের ভিত্তিতে গুলি? সংখ্যালঘুরাই বা কেন বাজে কথা আর খোঁচানি শুনতে দলে দলে জনসভায় যান! এতবার দাঙ্গা-হাঙ্গামার পরেও ‘কে বন্ধু, কে শত্র“’ প্রশ্নে সংখ্যালঘুদের বোধোদয় ঘটল না কেন? মিডিয়ায় বৌদ্ধবিহার ও মালোপাড়ার অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন সত্ত্বেও কিভাবে পালিয়ে গেল? জানি বিষয়গুলো ঢাকা-দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়; কিন্তু এ জন্য ১৬ কোটি মানুষ ভুগবে কেন?

এক অবাক কাণ্ড। সব জেনেও ৯০ ভাগ মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে বুঝিয়ে দিলো, বাংলাদেশীদের এরা গরু-ছাগল মনে করে। তাদের কারণেই বহুমুখী বিপর্যয়ে দেশ আজ খাদের কিনারায়। ১৬ কোটির মধ্যে চেনে একমাত্র হাসিনা। তা কী করে হয়? সুতরাং ভোট চুরির নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রণব বাবুরা আবারো প্রমাণ করলেন ভারতের গণতন্ত্র কত ভুয়া। একই কাণ্ড কি আমরা করতে পারতাম? শুধু সংখ্যালঘুদের ভোটে লোকসভার নির্বাচন কবুল হলে যা ঘটত, ৪৬-এর প্রত্য সংগ্রাম দিবসের রায়ট ও গণহত্যা থেকে কিছুটা অনুমান করতে পারি। এরা ইন্দিরাকেও জেলের ভাত খাইয়েছে। আসল ঘটনা মালোপাড়া নয় বরং চুরির নির্বাচনের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান ঠেকাতে উপনিবেশবাদীদের গোয়েন্দা অপারেশন। অন্য দিকে মতা ধরে রাখার জন্য এমন একটিও কাজ নেই যা করছে না সরকার। যে জাতি ‘জয় বাংলাদেশ’-এর সাথে ‘জয় বাংলা’র পার্থক্য বুঝতে অম, জাতি হিসেবে তারা অপদার্থ।

উদ্ভট কাণ্ড বটে। অপরাধী যে-ই হোক, দিল্লি-ঢাকার এক সুর, সব দোষ খালেদা আর জামায়াত-শিবিরের। এর আগে খালেদা ছিনতাই, এরশাদ গুম, চুরির নির্বাচনে হাজার কোটি রুপির রসদ জুগিয়েছে বলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ। বিরোধী দলগুলোর হাড়গোড় চুরমার করা শেষ। ফলে বিচারবহির্ভূত খুনের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সরকারের অন্ধ ভারতপ্রীতি দৈনন্দিন জীবনে এনেছে চরম নৈরাজ্যবাদ। স্বৈরাচারের কফিনে মুণ্ডুহীন গণতন্ত্রের শব। ’৭১ পূর্ববর্তী স্বৈরতন্ত্র এমন দুর্বিষহ ছিল কি-না সন্দেহ। এর খেসারত সবাই দিলেও সংখ্যালঘুরাই দিচ্ছে বেশি।

এই দাগে নির্বাচন আর নির্যাতন চলছে এক সমান্তরালে। নির্বাচন পরবর্তী ‘অপারেশন মাইনোরিটিকে’ কেন্দ্র করে এক দিকে ‘ফেরাউনের’ মতো তাড়া করছে মৃত্যুর ভয়, অন্য দিকে ‘কঙ্গোর মতো’ যত্রতত্র বন্দীদের লাশ। সংখ্যালঘু ইস্যুকে পুঁজি করে রীবাহিনীর মতো আবারো হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। ফলে উভয় পরে মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা বাড়ছে। যৌথবাহিনীর তাণ্ডব মনে করিয়ে দিচ্ছে, কৃষ্ণাঙ্গ হত্যাকাণ্ডের নারকীয়তা, নাৎসি নৃশংসতা, টুটসি হত্যাকাণ্ড,

পাকিস্তানিদের বর্বরতা…। ’৭২ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগও কি ইতিহাসের জন্য কলঙ্ক কিছু কম রেখেছে? ভিন্ন মতের অভিযোগ, অদৃশ্য কলকাঠি নাড়ছে একটি বিদেশী দূতাবাসের রহস্যজনক সংস্থা। হাসিনাকে আজীবন মতায় রাখতে খালেদাকে বিলীন করতে চায় গোয়েন্দারা। মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী হাজার কোটি রুপির মহাপরিকল্পনার ৫০ ভাগ সম্পন্ন, বাকি ৫০-এ খালেদাকে পাঠানো হতে পারে মিউজিয়ামে। ফলে রহস্যমানবদের হাতে পড়ে সংখ্যালঘুদের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি।

ঘটনাপ্রবাহ

আজীবন সংখ্যালঘু অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, হিন্দুদের দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী হিন্দুরাই। আমার লেখায় সাম্প্রদায়িকতার নর্দমা খুঁজে লাভ নেই, নিজেই ভুক্তভোগী, সাম্প্রদায়িকতা বুঝি না, পছন্দও করি না। আমার সংখ্যালঘু জীবন অভিজ্ঞতা অপরিসীম এবং অসমান্তরাল। দেখেছি কেঁচোর মতো এরাও দেয়াল ছাড়া দাঁড়াতে পারে না। ৬৭ বছর ধরে সমাজ, ধর্ম, রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান পরগাছা থেকে জঙ্গলে রূপান্তরিত হয়েছে। এই দাগে কিছু সংখ্যালঘু রাজনীতিক এবং সাংবাদিকের আত্মঘাতী এবং অন্ধ আচরণে আবারো প্রমাণ হলো, এদের কোনো শত্র“ লাগে না বরং নিজেরাই নিজেদের নির্মূল করতে যথেষ্ট। এত দৃষ্টান্ত সত্ত্বেও ওদের সাম্প্রদায়িক চেহারা চিনতে আমিও এতকাল ভুল করেছি। রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ দেখে ভয় হচ্ছে, মেরুদণ্ডহীনতার সুযোগে তলে তলে বড় একটি উমিচাঁদ গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে আওয়ামী লীগ। আর এদের মাধ্যমেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ কোম্পানির মতো একটি নতুন কোম্পানি দেশের মধ্যে তাণ্ডব চালাচ্ছে। কারণ এরা জানে, হিন্দুদের বন্ধু বলে কিছু নেই, দেশ বিভাগের পর থেকেই এতিমের বাচ্চা, না ঘরকা, না ঘাটকা। বন্ধুদের বাইরেরটাই চিনল, ভেতরটা নয়। বৌদ্ধবিহার আর মালোপাড়ার ঘটনার পর আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেতা আর অসাম্প্রদায়িকতার দাবি অযৌক্তিক। বরং এতে সাম্প্রদায়িক ও চরমপন্থী চেহারাই উন্মুক্ত হলো। এরপরও সংখ্যালঘু সুশীলদের সুবিধাবাদী ভূমিকা অসহনীয়।

সুতরাং বাস্তবতা হলো, ৬৭ বছর ধরে এই ভূখণ্ডে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় এককভাবে লাভবান হয়েছে গান্ধী আর মুজিব পরিবার। দুই-একটি ঘটনা বাদে ভারতের সংখ্যালঘুদের ঘাঁটি বরাবরই শক্ত হলেও এপারের সংখ্যালঘুদের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। ওপারে যখন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে, এপারে সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার আরো বেশি ুণœ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দিল্লি কখনোই টুঁ শব্দটিও করেনি। আর ’৭১ পরবর্তী সংখ্যালঘুরা ভোটব্যাংক পন্থা বেছে নিয়ে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারল। আমাদের ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান’ মার্কা অথর্ব সংগঠনগুলো সর্বনাশের অন্যতম কারণ। ধর্মীয় সংগঠনগুলো দিকনির্দেশনায় পুরোপুরি ব্যর্থ। কিছু হলেই এরা একটি বিশেষ দলের আঁচলের তলে আশ্রয় খোঁজে, যা তাদের জন্য যেমন আত্মঘাতী তেমনিই ভ্রষ্টাচার। আদর্শভিত্তিক সংগঠন এবং অ্যাক্টিভিজমের অভাবে ’৭১ পরবর্তী দেশে আওয়ামী আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নৈতিকভাবে শুকিয়ে মরছে

সংখ্যালঘুরা। ড. কিং বলেছেন, ‘যারা মৃত্যুর জন্য ভালো কারণ খুঁজে পায় না, বেঁচে থাকার অযোগ্য তারা।’ আমার দেখা সংখ্যালঘুদের বেলায় কথাটি হাড়ে হাড়ে

প্রযোজ্য।

 

ভ্রষ্ট পররাষ্ট্রনীতি

একচোখা বটে। অন্ধ আওয়ামীপ্রীতি এবং ভ্রষ্ট পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে আমাদের প্রচণ্ড ক্ষতি করেছে কংগ্রেস। ’৪৬-এর দাঙ্গার পর খুলনা-নোয়াখালীতে গণহত্যা ছড়িয়ে পড়লে ‘গান্ধী’ এসে আগুনে পানি ঢাললেন। এরপর ডজনখানেক যুদ্ধ-দাঙ্গায় আগুনে ঘি ছাড়া আর কী ঢাললো কংগ্রেস? ’৪৭-এর মতো মাইগ্রেশন ক্রাইসিস হবে জেনেও, ’৭১-এ পুরনো প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ল বাপকা বেটি। ফলে স্বাধীন দেশেও সংখ্যালঘু অসুখটি ’৭১ পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে খারাপ। তখন অন্ধকারে যত হেটক্রাইম হতো, এখন দিনের আলোয় হয় তার চেয়ে বেশি। তখন তুলকালাম হতো, এখন হয় না। শরণার্থীদের বিরাট অংশ হাওয়া। ’৭৩-৭৫ জুড়েই রীবাহিনীর ভ্রষ্টাচারে মাইগ্রেশনের উত্তাপে একটি কথাই স্পষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ হলেও স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রতি কারণে বা অকারণে তেমন আস্থা জানায়নি হিন্দুরা। তবে যে কারণেই হোক, মিশন বরাবরই অব্যাহত রেখেছে। সমস্যা হলো, ধর্মনিরপেতা আর অসাম্প্রদায়িকতার কুইনাইন দিলেই গণতন্ত্র বা সংখ্যালঘু অসুখ ভালো হয় না। তবে মানুষ মারা গণতন্ত্রের মাশুল দিচ্ছে সংখ্যালঘুরাই বেশি। ওদের পিপীলিকা মস্তিষ্কে এসব ঢোকে না। আমার অভিজ্ঞতায়, ওপারে ’৬৪-এর হজরতবাল, ’৯২-এর বাবরি মসজিদ, ২০০২-এর গুজরাট ধরনের ঘটনা না ঘটালে এপারের সংখ্যালঘুরা হয়তো তেমন সাম্প্রদায়িক হতো না। সাথে সাথে এ কথা সত্যও, ভারতীয়রা খুঁচিয়েছে বলেই বারবার উত্তপ্ত হয়েছে কিছু অঞ্চল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কিছু হলেই লেজ তুলে দৌড়াতে হবে। অর্থাৎ ৬৭ বছরেও এরা যেমন সাবালক হলো না তেমনই এই ভূখণ্ডের রাজনীতি জঙ্গলই থেকে গেল।

এ দিকে অবৈধ মাইগ্রেশনে ভারতের ভূমিকা এবং ভ্রষ্ট পররাষ্ট্রনীতি মাইগ্রেশনকে শুধু তীব্রই করেনি, একটি

শান্তিকামী জাতিকে বিস্ফোরোণমুখীও করেছে। সীমান্তের ওপারে পৌঁছলেই ভোটার কার্ড দিয়ে রেকর্ড করেছেন বাবু জ্যোতি বসু। ফলে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় রুখে দাঁড়ানোর বদলে বারবারই সুবিধাবাদীর পথ বেছে নিয়েছে সংখ্যালঘুরা। একমাত্র যুদ্ধকালীন ছাড়া মাইগ্রেশনের এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোথাও নেই। …গভীর রাতে বসতভিটা ফেলে অপেমাণ গরুর গাড়িতে বাক্সপেট্রা গুছিয়ে ফালাকাটা চলে গেলেন কিশোরীকাকা। গেছেন আরো লাখ লাখ কিশোরীকাকা। পর্যায়ক্রমে বদলে গেলো প্রতিবেশী, সাইন বোর্ড ও মালিকানা। আইয়ুব জামানায় লুকিয়ে থাকা বাড়িবিনিময়, মুদ্রাপাচার এবং সীমান্ত পার করা দালালেরা খুঁজতে থাকল কায়েন্ট। বিনিময়ের পার্টি আনলে দালাল কালিবাবুকে বাবার সাফ জবাব- না। অথচ নোয়াখালী, কুমিল্লা, সোনারগাঁও… কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকা বাদে মাইগ্রেশনের মতো ভয়াবহ কিছু না ঘটায় এই হারে দেশত্যাগ যেমন দুঃখজনক তেমনই মাতৃভূমির সাথে বেঈমানি। যখন আরো বড় হতে থাকল কলকাতার পার্কসার্কাস, চোখের সামনে ছোট হয়ে গেল আমার কৈশোরের দত্ত, বণিক, ঘোষপাড়া। ৪২ ভাগ কমে ৯ ভাগ এবং ২.৬ মিলিয়ন একর শত্র“সম্পত্তির কোনো গবেষণা হলো?

কিন্তু এত কিছুর পরও মাইগ্রেশন নীতিতে গান্ধী বা মুজিব, এক ফোঁটা কালিও খরচ করলেন না! বরং শত্র“সম্পত্তিকে অর্পিতসম্পত্তি বানিয়ে ভূমিদখল এবং নির্যাতনের অনুকূলে দ্বিতীয় দফা বন্দোবস্ত হলো। ’৭১-কে কেন্দ্র করে আরো মানুষ দেশান্তরি হলো। ’৭১ এদের স্বস্তি দিতে ব্যর্থ বলেই এই ধারা অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ। যা বলতে চাইছি, বিনিময়ের সুযোগ পেলেও বাবা কিংবা শুধাংশু রায় কোথাও যাননি; কিন্তু পরাজয়ও মানেননি। এসব দেখেই কাটল জীবনের প্রথম ২৫ বছর। সুতরাং এপারের ইস্যুতে দিল্লি যদি আগাগোড়াই নিরপে ভূমিকা নিতো, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। মনে হয় এই ভূখণ্ডকে তাদের স্বাধীন ভাবতে কষ্ট হয় কিংবা ভাবেন না বলেই আগ্রাসন।

বাস্তবে ‘হলোকাস্ট’ নয় বরং ‘দেশ বিভাগই’ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক দুর্যোগ। মাত্র ছয় মাসে প্রায় ১৫ মিলিয়ন মাইগ্রেশন, দেড় মিলিয়ন খুন, এক মিলিয়ন নিখোঁজ, এরই ধারাবাহিকতায় ’৫০, ’৬৪, ’৯২-এর রায়ট… বৌদ্ধবিহার, মালোপাড়া। তবে “হলোকাস্টের ইতিহাস দিন দিনই আরো উত্তাপ ছড়ালেও পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি যারা মু্িক্তযুদ্ধের জন্য সব শক্তি ব্যয় করছি; কিন্তু দেশ বিভাগের মতো মুক্তির প্রথম সংগ্রামকে কবর দিয়েছি।’ খুন, ধর্ষণ, জ্বালাওপোড়াও, ধর্মীয় আগ্রাসন… মনে রাখতে হবে, আজকের ক্রাইসিসের গোড়া ’৪৭। এই ইতিহাস লুকিয়ে মালোপাড়ার সমাধান হবে না। ইতিহাস সাক্ষী, নেহরুর কঠোর অবস্থানের কারণেই দেশ বিভাগ, অন্যথায় তিন মুণ্ডু দানবের পয়দা হতো না। গাছের গোড়া কেটে পানি ঢাললে সংখ্যালঘু অসুখের চিকিৎসা সম্ভব নয়। তবে এ কথাও ঠিক, বৈষম্য সর্বত্রই। তার মানে এই নয় যে, কথায় কথায় পালাতে হবে। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সাদা এবং কালোদের এক বাসে বসার বিরুদ্ধে আইন ছিল। শূদ্রের ছোঁয়া লাগলে ব্রাহ্মণের জাত যায়। ধনী-গরিবের বৈষম্যের জন্য কুখ্যাত বাংলাদেশ। প্রশ্ন, সংখ্যালঘুদের মেরুদণ্ডের হাড় সোজা না বাঁকা? যা বলতে চাইছি, আমার বাবা কিংবা রায়বাবুরা সারা জীবন দাঁড়িয়েই ছিলেন কারণ তারা জানতেন, দাঁড়িয়ে না থাকলে পিঠের ওপর চড়ে বসতে পারে, তাই বসার বদলে সারা জীবন দাঁড়িয়েই কাটিয়েছেন।

একি কথা! রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং ভূমির অধিকার নিয়ে ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে যুদ্ধ চললেও এসব প্রশ্নে উভয় দেশেরই নির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি আছে, যে কথা আমরা বলতে পারি না। ইসরাইলের অনুমতি ছাড়া একজন ফিলিস্তিনিও সীমান্ত পার হতে পারবে না; কিন্তু আমাদের মেঘালয় আর হিলি বন্দর অবৈধ মাইগ্রেশনের রেকর্ড ভেঙেছে। সুতরাং সব দুর্যোগের জন্য অতীতে মুসলিম-লীগ, এই দাগে জামায়াত-শিবিরের ওপর দায় চাপানো পাগল বা প্রতিবন্ধীর পরিচয়। সে জন্য ভালো ডাক্তার আনতে হবে। অন্যথায় রোগী মারা যাবে। সরকার মনে করে, সব রোগেরই ওষুধ কুইনাইন অর্থাৎ বন্দুকের নলের জোরে গণতন্ত্রের অসুখ সারাবে। তা কী করে সম্ভব?

ওদের কি লাজ-লজ্জা নেই! এই দাগে প্রকাশ্যে ভোটারদের মৌলিক অধিকার হরণে অংশ নিয়ে বড়ই অন্যায় করল ভারত। এতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হলো। অস্থিরতা বাধিয়ে রেখে নিজেদের এজেন্ডা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চাইছে দিল্লি। তাই সামান্য বিরতি দিয়ে নির্বাচনের পরেই চাহিদার তালিকা নিয়ে আবারো হাজির পঙ্কজ শরণ। ব্যবসায়ীর জাত এরা, বাঘ চড়েছে আওয়ামী লীগের পিঠে, ব্রিটিশ রাজদের মতোই সহজে নামছে না। আগেও বলেছি, ছোট বেনিয়ার হাত থেকে পড়েছি বড় বেনিয়ার হাতে। সুতরাং দিন দিনই ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আরো ঘনীভূত হওয়ার কারণ ফেলনা নয়। ঠিক সময়মতোই বিগড়ে যায় এই ভূখণ্ডের মানুষ। কারাগার ভরে ফেললেও এই সেন্টিমেন্ট আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ইতিহাস সাক্ষী, দেশ বিভাগের গণহত্যা হলোকাস্টের চেয়েও বড়। ৫ জানুয়ারিতে সরকার যেমন নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারল তেমনিই ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টের ঊর্ধ্বগতিতে আবারো বিষফল ভোগ করতে হতে পারে দিল্লিকে এবং ভোগ করবে সংখ্যালঘুরাও।

এই দফায় উপনিবেশবাদ কায়েমে ১৬ কোটি মানুষের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে এরা। ফলে উদ্ভূত সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দেয়ার সুযোগ নিচ্ছে উভয় দেশ। দিল্লি আমাদের মঙ্গল চায় না, সম্পদ চায়। বাংলাদেশকে এরা ইরাক-আফগানিস্তানের চোখে দেখতে শুরু করেছে। নাগরিকদের মধ্যে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়ে কর্তৃত্ব করছে ‘জলে-স্থলে-বন্দরে’। জোর করে চাপিয়ে দেয়ার রেকর্ড ভাঙছে। বঞ্চনা আর আধিপত্যবাদে রাখাঢাক নেই। সিকিম প্রথা এখানেও চালু করতে চাইছে কংগ্রেস। এদের হিটলারিক কর্মকাণ্ডে হিটলারেরই প্রেতাত্মা, যা তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে ’৩০-এর দশক থেকে যখন ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের বেশির ভাগ নেতাই হিটলারের দরগার মুরিদ। হিমলার, হেস, হিটলারের ছিল হিন্দুস্তানপ্রীতি এবং নাজি পার্টির মনোগ্রামটি বৈদিক, কাপালিক শিবসেনাদের কপালেও হিটলারের ‘সোয়াস্টিকা’… যা ভিন্ন আলোচনা। ভারতের সন্ত্রাস বিশ্ব জানে। হাসিনা ভুললেও গুজরাটের দাঙ্গার কথা ভোলেনি ‘স্টেট ডিপার্টমেন্ট’। মোদিকে তারা ভিসাই দিলো না। আর চরমপন্থীদের হাতে বাবরি মসজিদের ঘটনা তো এপারের সংখ্যালঘুদের জান খারাপ করে ফেলেছে। খুনিদের ওপর ভর করে ডাইনেস্টি কায়েম!

আসল কথা, খালেদার ৯০ ভাগ জনপ্রিয়তা দিল্লির আরশ কাঁপিয়ে দিয়েছে। দূতিয়ালি করতে আসা সুজাতা সিংদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে লজ্জাহীন হস্তেেপ আমার বিশ্বাস, অন্য যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশ হলে অবশ্যই বের করে দিতো। ‘আমরা লজ্জাহীন বলেই ওরা কাপড় খুলে ফেলেছে।’ রাজনীতির তলে ‘মন’ বলে একটি বিষয় আছে যা কখনো কখনো ব্যক্তির মতার বাইরে চলে যায়। ’৭০-এর দশকে রাশিয়াকে শিক্ষা দিতে ‘তালেবান’ সৃষ্টি করা মার্কিনিরাই এখন যুদ্ধ করছে তালেবানদের বিরুদ্ধে। কেন করছে? সুতরাং সন্ত্রাসহীন দেশে সন্ত্রাসের নামে ৯ আর ১০ ভাগের মধ্যে যে গণ্ডগোল বাধাল, এর মূলে দিল্লির গোয়েন্দা কৌশল। সিআইয়ের পরেই ওদের মতা। সুতরাং সুজাতা সিংদের কারণে জঙ্গিবাদের উত্থান হলে ভবিষ্যতে মার্কিনিদের মতোই মাশুল দিতে পারে ভারত। আরএসআর, বিজেপি, শিবসেনাদের মতো পরীতি সন্ত্রাসীদলগুলো যে দেশে প্রকাশ্যে রাজনীতি এবং নির্বাচন করে, তাদের মুখে সন্ত্রাসের অভিযোগ মানায়? ’৯২-এর ম্যাসাকারে সক্রিয় অংশ নিয়েছে শিবসেনা আর বিজেপির খুনি কাপালিকরা। বোম্বের ত্রাস এরা, আজব্দি প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী করছে প্রয়াত ‘বালঠাকরের’ সেনাসৈন্যরা। এদের হাতে কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত জিম্মি। সুতরাং সুজাতার সন্ত্রাস প্রলাপ এখানেই বন্ধ হয়ে যায়।

 

নিউ ইয়র্ক প্রবাসী

VN:F [1.9.22_1171]
Rating: 0.0/10 (0 votes cast)
VN:F [1.9.22_1171]
Rating: 0 (from 0 votes)