নেতাজী ফাইল, কংগ্রেসমুক্ত ভারত এবং প্রণবের চোখে জল

March 7, 2018 in Bangla Blog, Weekly Joy Newspaper

দুই বাংলার দুই পরিত্যাক্ত বীর। রাজনৈতিক মারদাঙ্গাতেও একই খলনায়কদের চরম নৃশংস্যতার শিকার। তাদের একমাত্র অপরাধ- আপোষ নয় বরং সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা। একজন দূরে থেকে জ্বালিয়ে দিলেন স্বাধীনতার আগুন, অন্যজন সশস্ত্র সংগ্রামে মাঠে। এরপরেও তারা পরিত্যাক্ত কেন, সেটাই লিখবো।
প্রণববাবু কাঁদছেন কিন্তু কেন? ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়া দিল্লির মসনদে একটি পদও নেই, যা তিনি ভোগ করেননি। “যেখানেই পা রেখেছেন, প্রণববৃক্ষগুলো এমনভাবে রোপন করেছেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা দুই দেশের পক্ষেই অসম্ভব, বিশেষ করে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে তার রেখে যাওয়া বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি নির্ধারণ।” অধিকাংশই রাজনীতিতে প্রণব ফ্যাক্টর বুঝতে অক্ষম। সেজন্যই তিস্তার পানি কিংবা ৫ জানুয়ারির দোলাচলে এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনীতি।
ইন্দিরার হাত ধরে সোভিয়েত মডেলের করাপ্ট কম্যুনিস্ট গণতন্ত্র এবং ক্যাস্ট্রো মডেলের পারিবারিক রাজতন্ত্র, দুটোই ভারতকে খাইয়েছেন, বাংলাদেশেও পাচার করেছেন বলেই সংসদের চেহারাটা এরশাদের মতো। ব্যতিক্রম একটাই, বিএনপিমুক্ত রাজনীতির চিফ আর্কিটেক্ট এখন কংগ্রেসমুক্ত ভারতের বিরুদ্ধে কাঁদছেন।
তীব্র প্রতিরোধের মুখে, ৬০ বছর দেরিতে হলেও কংগ্রেসের হাতে জিম্মি নেতাজীর প্রায় দেড় শতাধিক সিক্রেট ফাইল অবমুক্ত করে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিলো বিজেপি। ফাইলগুলো বন্দি রাখতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছে চক্রান্তবাদিরা। তারা চায়নি, ভারতীয় রাজনীতিতে অন্য কারোই আধিপত্যবাদ থাকুক। অধিকাংশেরই বিশ্বাস, নেহেরু নয়, নেতাজীর সশস্ত্র সংগ্রামের প্রভাবই ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার সূত্রপাত। ১৯৫৬ সনে যে কথাটি স্বীকার করেছিলেন, ৪৭এর ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি।
প্রায় ৭০ বছর নেতাজীর অবদান অস্বীকার করা ছাড়াও দিল্লির মসনদে একক আধিপত্যবাদ কংগ্রেসের। নেতাজীর ফাইলে ২০ বছর ধরে গুপ্তচরবৃত্তি। নেতাজীকে অবলুপ্ত করারও প্রমাণ। ঘটনাগুলোকে চরম বিশ্বাসঘাতকতার চোখে দেখছে অধিকাংশ ভারতীয়রা। ক্ষমতায় গেলে বন্দি ফাইলগুলোকে কংগ্রেসের থাবা থেকে মুক্ত করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিলো বিজেপির। স্বাধীনতার প্রকৃত বীরকে যথাযথ সম্মান দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি। বিজেপি মনে করে, নেহেরু একজন খলনায়ক, আসল বীর নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস। লিখেছিলাম, লিবারেলিজম একটি মানসিক ক্যান্সার। শত্রুদের সঙ্গে আপোষ করে ক্ষমতায় থাকে। নেহেরু ডায়নেস্টিকে যাদুঘরে পাঠাতে বিনা কারণেই বিজেপিকে ভোট দেয়নি ভারতীয়রা।
ফাইলে প্রমাণ, নেহেরুই তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন। বিদেশে গেলেও চক্রান্ত। এমনকি ওয়্যার ক্রিমিনালের তকমা লাগিয়ে দেশে ঢোকাও বন্ধ করেছিলেন। মৃত্যু নিয়েও গুজব ছড়িয়েছিলেন। ২০ বছর ধরে গুপ্তচরবৃত্তি- নেতাজী বনাম নেহেরু, স্ক্যান্ডেল এখন গ্লোবাল।

বিপ্লবী নেতাজী:-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ব্রিটিশের শত্রুশক্তির সমর্থন এবং পৃষ্ঠপোষকতায়, জাপানের হাতে যুদ্ধবন্দি প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য দিয়ে সশস্ত্র আজাদহিন্দ ফৌজ গঠন। ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে এছাড়া কোন উপায় ছিলো না। নেতাজী বিশ্বাস করতেন, সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া ভারত ছাড়বে না ব্রিটিশ। ১৯৪৩ সনেই গান্ধির ব্যর্থ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন বুঝতে পেরেছিলেন। নেহেরুর মতিগতিও টের পেয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় লুকিয়ে দেশের বাইরে গিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের আয়োজন।
বীর নাকি বিট্রেয়ার প্রশ্নে, খলনায়কদের মুখোশ খুলে দিলো অবমুক্ত ফাইল। প্রধানমন্ত্রী হয়েই পাঠ্যপুস্তকসহ সবকিছুর উপরেই নেতাজীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নেহেরুর। নেহেরু থেকে সোনিয়া, একচুল ব্যতিক্রম হয়নি।
নেতাজী থাকলে, ইনডিপেনডেন্ট এক্ট ১৯৪৭এর অধীনে স্বাধীনতার নামে দুটি ডোমিনিয়ন স্টেট গছিয়ে দেওয়া অসম্ভব (১৯৫০ এবং ১৯৫৬, পাকিস্তান-ভারত ডেমিনিয়ন থেকে রিপাবলিক)। ভেতরে ইংলিশ, বাইরে ভারতীয় নেহেরুকে ব্রিটিশের পছন্দের কারণ, একমাত্র তাকে দিয়েই আপোষের স্বাধীনতা সম্ভব। মাউন্টব্যাটেনের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার সুযোগও নিয়েছিলো ব্রিটিশ। এছাড়া উপায় ছিলো না। কারণ, সশস্ত্র বিপ্লব রুখতে তখন যে ৫ লক্ষ সৈন্য প্রয়োজন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইংল্যান্ড থেকে আনা অসম্ভব। এদিকে অনুগত ভারতীয় সৈন্যরাও ততোদিনে আজাদহিন্দ ফৌজের আদর্শে অনুপ্রাণিত। ১৯৪৫ সনে ফৌজের বিচার শুরু হলে, আরো বেশি অনুপ্রাণিত। কারণ এতে নেতাজীর আদর্শই ছড়িয়ে যাচ্ছিলো।
তদন্ত কমিটির কাছে নেহেরুর স্টেনোগ্রাফারের বক্তব্য, স্ট্যালিনের হাতে বন্দি নেতাজীকে যুদ্ধাপরাধীর খাতে ফাঁসি দিতে ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি। ১৯৪৬ সনের আরেকটি চিঠিতে প্রকাশ, নেতাজী দেশে ফিরলেই তরবারি দিয়ে মোকাবেলার হুমকি। এতেই প্রমাণ, জীবিত নেতাজী নেহেরুর জন্য কতোবড় হুমকি।
আইন অনুযায়ী ৩০ বছর পরে কোন ফাইলই সিক্রেট থাকে না। প্রায় ৮০ হাজার পৃষ্ঠা কেলেংকারী প্রকাশের পরেও নেতাজীর বীরত্বকে অস্বীকার প্রণববাবুদের? পার্লামেন্টে উন্মুক্ত আলোচনায়ও বাঁধা। ১৯৯৯-২০০৫ পর্যন্ত ‘মুখার্জি কমিশনের’ সরেজমিনে তদন্ত রিপোর্টটিও প্রণবদের নাকোচ। মুখার্জি কমিশনের কাছে প্রণবের অসহযোগিতা এবং হুমকি-ধামকিরও অভিযোগ তদন্ত কর্মকর্তার। স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন বীরের কপালে রাজাকারের তকমা পরিয়ে, আজাদহিন্দ ফৌজের সৈন্যদেরকে রেডফোর্টে বিচারে নেহেরুকেই সমর্থন প্রণবদের। এর মানে, নেতাজীই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় ঈর্ষা?
আমাদের মতো পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক বাদ দিয়ে, ইতিহাস স্বীকার করলে, নেতাজীই প্রথম প্রধানমন্ত্রী। বিষয়টির সমর্থনে ইতিহাসে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ। “আমি সুভাষ বলছি” খ্যাত নেতাজীর আন্দোলনের শুরুতে সাবমেরিনে ৬ মাস… বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সিঙ্গাপুরে পৌঁছে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্থতি। ২৩ অক্টোবর ১৯৪৩ সনে জাপান সরকারের সহায়তায় স্বাধীন সরকার গঠন। ব্রিটিশমুক্ত আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে তিনরঙা পতাকা উত্তোলন। কয়েকটি ফ্রন্টে তুমুল যুদ্ধ করে বিজয়। কিন্তু পরাজয় ঘটলো বার্মায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান ও জাপানের পতন না হলে, লক্ষ্যে পৌঁছাতেন নেতাজী। সেই সুযোগেই মৃত্যুর গুজব রটালো ব্রিটিশ-নেহেরুচক্র। কারণ নেতাজী ফিরলে, সামলানোর ক্ষমতা ছিলো না কারোই। ততোদিনে আজাদহিন্দের দেশপ্রেমে উদ্ভাসিত।
অবমুক্ত ফাইলের আরেকটি কলংক, ‘ওয়্যার চেস্ট’ নিয়ে প্রতারণা। সশস্ত্র সংগ্রামের খর্চ পোষাতে দেশপ্রেমিক প্রবাসী ভারতীয়রা তখন পূর্ণ আস্থা দেখিয়ে মুক্তহাতে দান করেছিলেন নিজেদের স্বর্ণ-মুদ্রা। ১৯৫৬ সনে প্রায় ৫০০ কিলোগ্রাম স্বর্ণসহ ‘ওয়্যার চেস্টের’ খবর জানানোর পরেও পুরোপুরি উপেক্ষা করলেন নেহেরু। ফলে মাত্র ১১ কেজি বাদে সব লুট, যা এখন ন্যাশনাল মিউজিয়ামে। বিজেপির অভিযোগ, কংগ্রেসই লুটপাট করেছে।
এমনকি গান্ধিও বিশ্বাস করেননি নেতাজী মৃত। তাইপেতে ওইদিন কোন বিমান দুর্ঘটনাই হয়নি বলে মুখার্জি কমিশনকে নিশ্চিত করেছিলেন তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৮-১৯৬৮, ২০ বছর ধরে গুপ্তচরবৃত্তির কারণ, জীবিত নেতাজীর গতিবিধির উপর চোখ রাখা। বিমান দুর্ঘটনার খবর ভূয়া না হলে, গুপ্তচরবৃত্তির প্রয়োজন ছিলো কী? “বীরের সম্মান তো দেয়ইনি বরং পরিবারের উপর গুপ্তচরবৃত্তিতে ক্ষিপ্ত বোস পরিবার জানতে চায়- কেন?”


কংগ্রেসমুক্ত ভারত বিতর্ক তুঙ্গে কেন:-
১) নেতাজী এবং পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
২) কংগ্রেস শাসনামলে ব্যাপক দুর্নীতি।

উইকিলিক্স এবং পানামা পেপার্স অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের অন্যতম সোনিয়া গান্ধি ১৫ বিলিয়ন ডলারের মালিক। মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অফশোর একাউন্টের টাকা বৈধ করে ফিরিয়ে আনারও প্রমাণ। টাটার মতো ব্যবসায়ী নন যে, এতো টাকা থাকবে। সংবাদটি সোনিয়াও অস্বীকার করেননি। বরং ড. শুভ্রামানিয়াম স্বামীর মতো চৌকস বিজেপি নেতাদের কারণেই, ২০১৭ সনে পার্টি চেয়ারম্যানশিপ থেকে সোনিয়ার পদত্যাগ। হার্ভার্ড-কেমব্রিজের ভূয়া সার্টিফিকেট নিয়ে মা-পুত্রের প্রতারণা প্রকাশের পরেই অজুহাত, এটা নাকি ‘টাইপোট্রফিকাল’ ভুল। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েও প্রতারণা। ভারতীয় আইনে দ্বৈত নাগরিক হলে প্রধানমন্ত্রীত্বে নিষেধাজ্ঞা। সোনিয়ার জন্ম ইতালিতে। রাহুলেরও তিনটি নাগরিকত্ব। তার বিরুদ্ধে বিপুল ডলারসহ মার্কিন এয়ারপোর্টে গ্রেফতার এবং কোকেন এ্যাডিক্সনের অভিযোগ। রাহুলকে অধিকাংশ ভারতীয়রাই বোকা মনে করে। মা-পুত্র দুজনেরই প্রধানমন্ত্রীত্বের সম্ভাবনা ফিনিশ।
মহানুভবতা নিয়ে সোনিয়ার প্রতারণার মুখোশ খুলে দিলেন ড. স্বামী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সোনিয়াই শপথ নেবেন কিন্তু ওই দিন সকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে স্বশরীরে হাজির হয়ে প্রেসিডেন্ট ড. আবুল কালাম আজাদকে সোনিয়ার দ্বৈত নাগরিকত্ব জানিয়ে দিলেন ড. স্বামী। এরপরেই বিকেলে শপথ নেন মনমোহন সিং। ড. স্বামী তাকে সার্কাস সিং ডাকার কারণ, সার্কাসের সিংহরা রিং মাস্টারের কথায় চলে। অভিযোগ, সোনিয়াই রিং মাস্টার, যার কথায় উঠবোস করতেন সার্কাস সিং।
কয়েকটি মামলা নিয়ে আদালতে ড. শুভ্রামানিয়াম স্বামীর হাতে ইতোমধ্যেই ফেঁসে গেছে গান্ধি পারিবার। ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোনিয়াকে ইনকাম ট্যাক্সের ৪১২ কোটি রূপি জরিমানার সিলগালা ফাইলটি মার্চে শুনানির অপেক্ষমান। নেহেরু প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল হেরার্ল্ড’ পত্রিকাটির নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ভূমি জালিয়াতি এবং ৫ হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণের মামলাটিও আদালতে। ঋণের সুপারিশ করেছিলো ‘ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি’ যা বেআইনী। ‘ইয়াং ইন্ডিয়ান’ নামে একাধিক কোম্পানি খুলে, ছদ্দনামে হাজার হাজার কোটি রূপি প্রতারণার মামলাও রাহুলের বিরুদ্ধে।
ইন্দিরার বিরুদ্ধেও imposter-এর অভিযোগ। তার নাম গান্ধি নয়। মহাত্মার সঙ্গেও সম্পর্ক নেই। স্বামীর নাম ফিরোজ Ghandy. Impostering করে যাকে গান্ধি বানিয়ে মহাত্মার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করাই উদ্দেশ্য। জরুরি আইন করে বন্দুকের নলে ক্ষমতায় থাকা, নেতাজীর উপর গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে যাওয়া… ইন্দিরার লেগেসির অন্যতম।


এখান থেকে কী শিখতে পারি? ১৯৭১এর ১৬ ডিসেম্বরের ঘটনা যদিও ২৪ বছর পর, কিন্তু আওয়ামী এবং কংগ্রেসের লিবারেলিজমে অদ্ভুত মিল। উভয়েই আধিপত্যবাদ, প্রতিহিংসা এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। ১৬ ডিসেম্বরের ডোমেনিয়ান মার্কা স্বাধীনতা থেকে আজো মুক্ত হয়নি বাংলাদেশ। ব্রিটিশরাও ডোমিনিয়ন মার্কা স্বাধীনতা গছিয়ে ভারত ছেড়েছিলো। আগেও লিখেছি, ভারতীয়দের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো পাকসেনারা।
বিজেপির অভিযোগ, প্রাদেশিক ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা সর্দার বল্লভ ভাই পাটেলের। কিন্তু গান্ধিকে নেহেরুর হুমকি, তাকেই প্রধানমন্ত্রী না বানালে কংগ্রেস তচনছ করে দেবেন। ভারাক্রান্ত চিত্তে গান্ধির কথাই মেনে নিয়েছিলেন পাটেল। গান্ধিও চাননি যে কোন অজুহাতে ব্রিটিশ থাকুক। পাটেলের সঙ্গে বিতাড়িত ‘তাজউদ্দিনের’ দুর্ভাগ্যকে কীভাবে মিলিয়ে দেখতে পারি? তাজউদ্দিন কন্যার লেখা ‘নেতা ও পিতার’ বিষ্ময়কর তথ্যের সঙ্গে অবমুক্ত ফাইলের স্ক্যান্ডেলকে কীভাবে মিলিয়ে দেখতে পারি?
ভারতীয়রা নেহেরুর নাম দিয়েছে, বিশ্বাসঘাতক-ক্রিমিনাল। অনেকেই ডাকে নিক্সন। তাদের মতে, ২০ বছরের স্ক্যান্ডেলের তুলনায় ‘ওয়াটাগেট কেলেংকারী’ কিছুই না। আমিও লিখেছিলাম এশিয়ান কিসিঞ্জারের কলাম। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের উদাহরণ দিয়ে ভারতীয়রা বলছে, তিনি নাকি সেই সারমেয়, প্রতিটি দরজায় ঢুকে হাড়-মাংস খেয়েও যার পেট ভরে না। অভিযোগ, ইন্দিরার মৃত্যুর পর বলেছিলেন, ইন্দিরা নাকি তার মায়ের মতো। উদ্দেশ্য, প্রধানমন্ত্রীত্ব বাগিয়ে নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী হতে না পেরে, নিজের দল খুলে নির্বাচনে গোল্লা খেয়ে ফের কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন। নেতাজীকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধি দিতে চাইলে মামলা করে বন্ধ করে দিলো সমর্থকেরা। তাদের যুক্তি, বিশ্বাসঘাতক হঠকারী রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরষ্কার নিতে দেবে না। বরং নেহেরুর মরোণত্তর বিচারের মতো, প্রণবেরও বিচারের দাবি জাতিয়তাবাদিদের।
কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার সেন্টিমেন্ট নিয়ে মাঠে অমিত শাহ্‌ের দল। এই দুঃখেই ভারাক্রান্ত প্রণবের কান্নাকাটি। কাঁদছেন আনন্দবাজার এবং কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবিরাও। তাদের প্রশ্ন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশে কী করে কংগ্রেসমুক্ত ভারত সম্ভব?
আমরাও তাই বলি। কারণ বাংলাদেশ থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিদায় করতে প্রণবই তো চিফ আর্কিটেক্ট। এজন্য কোন ফাইল ডিক্লাসিফাই করার প্রয়োজন নেই। কারণ খোলামেলাই বিএনপিমুক্ত বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ২০০৬ সন থেকে, যা নিজের বইতেই লিখেছেন। ভাপা ইলিশের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়ে শতভাগ বিএনপি-জামায়াতমুক্ত রাজনীতি কায়েম করে ছাড়লেন।
“নিজে বাঙালি হয়েও অন্যান্য বাঙালি বীরদের প্রতি চরম প্রতিহিংসা আমাদের ঘোষক বিতর্ককেও ডিক্লাসিফাই করে ৭১এর বীর বনাম বিট্রেয়ার প্রশ্নের অবসান ঘটালো।” নেতাজীর বিরুদ্ধে নেহেরুর পরিবার বনাম জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে আওয়ামী পরিবারের প্রতিহিংসা- পরিষ্কার। “প্রশ্ন, কংগ্রেসমুক্ত ভারত অন্যায় হলে, বিএনপিমুক্ত বাংলাদেশ কী ন্যায়?”
বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবিদের অনেকেই ভারতকে দুষছেন কিন্তু তাদের ধারণা ভুল। আগেও লিখেছি, “সমস্যা দিল্লি নয় বরং প্রণব।” আমাদের সকল বিষয়ে ৬০ বছর ধরেই অক্ষরে অক্ষরে তার কথা শুনছে দিল্লি। তিনিই একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি দিল্লির মসনদে বাঙালি হয়েও একক সামন্তবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এমনকি রাষ্ট্রপতির পদে না থেকেও দুর্দান্ত প্রভাব। সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, নির্বাচন বিষয়ে ঢাকাকে এবং ফিরে গিয়েই মোদিকে যথাযথ পরামর্শ দেবেন প্রণব। যথানুযায়ী মোদির কান বিষিয়েছেন। এরপরেই খালেদা জেলে। অতএব প্রণবমুক্ত রাজনীতি ছাড়া বাংলাদেশ বাঁচবে না। শুধুমাত্র এই রোগ শনাক্ত হলেই, বিজেপির অনুকরণে, আওয়ামী রোগমুক্ত বাংলাদেশও সম্ভব।

তথ্যসূত্র: ডিক্লাসিফাইড নেতাজী ফাইল।

-মিনা ফারাহ।
ইমেইল: [email protected]
০৩ মার্চ ২০১৮, নয়াদিগন্তে প্রকাশিত।

VN:F [1.9.22_1171]
Rating: 0.0/10 (0 votes cast)
VN:F [1.9.22_1171]
Rating: 0 (from 0 votes)