অপারেশন মাইনোরিটি – সংখ্যালঘু নির্যাতনে কার কী অবদান : ২

February 6, 2014 in Vested properties


 

অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে প্রফেসর বারাকাতের বই

বইটি যদিও খালেদাকে ঘায়েল করতেই লেখা, বাস্তবে হিতে-বিপরীত। পরিসংখানে আওয়ামী পকেটে যত বিলিয়ন ডলারের অর্পিত সম্পত্তি, এরপর সংখ্যালঘু নির্যাতন একা জোটের আপদ নয়। আওয়ামী সরকারের পেয়ারের মানুষ প্রফেসর বারাকাতের নেতৃত্বে অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে লেখা বইটি তাদের মুখেই চুনকালি। শত্র“ বুঝি, কিন্তু যারা লুটপাট করে তারা কী করে বন্ধু হয়! লিখেছেন, ‘১৯৬৫ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ৮০ ল সংখ্যালঘু পরিবার সরাসরি অর্পিত সম্পত্তির মাধ্যমে তিগ্রস্ত হয়েছে। ২৬ লাখ একর সম্পত্তি তাদের হাতছাড়া হয়েছে যার মূল্য বাংলাদেশের ২০০৭-এর জিডিপির প্রায় ৭৫ ভাগ।’ পরিসংখ্যান অনুযায়ী জামায়াত ও জাতীয় পার্টি খেয়েছে ১৪ ভাগ, তাহলে বাকি ৮৬ ভাগ কার পেটে? এরপরও আত্মশুদ্ধি আর এক্টিভিজম ছাড়া এই ভূখণ্ডের হিন্দুরা বেশি দিন টিকতে পারবে না। ওয়ালস্ট্রিটের জনপ্রিয় উক্তি, ‘টাকার বিষয়ে বন্ধু নেই’। বারাকাত লিখেছেন, ‘মাইগ্রেশন না হলে ৭১-এ হিন্দু জনসংখ্যা ৯.৬ মিলিয়নের বদলে ১১.৪ মিলিয়ন হতো। ১৯৮১-তে ১ কোটি ৬ লাখের বদলে ১ কোটি ৪৩ লাখ হতো, ১৯৯১-তে ১১.২ মিলিয়নের বদলে ১ কোটি ৬৫ লাখ, ২০০১ সালে ১ কোটি ৪ লাখের বদলে ১ কোটি ৯৫ লাখ। ১৯৬৪ থেকে ২০০১ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া হিন্দুর সংখ্যা ৮০ লরে বেশি।’ অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হলো; কিন্তু মাইগ্রেশন থামল না। সুতরাং ’৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী ধর্মনিরপে বাংলাদেশ, পরে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপে বাংলাদেশ কায়েমে শেখ হাসিনার এই মাপের ক্রুসেডের পরও এত মাইগ্রেশন কি আওয়ামী লীগের কপালে কলঙ্ক নয়? অথচ রাষ্ট্রধর্ম থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচের অনেক সংরণশীল দেশেও এই ধরনের দুর্যোগ আসে না; কিন্তু ধর্মনিরপে দাবি করা অসাম্প্রদায়িক দেশে সংখ্যালঘুদের হার ৪২ ভাগ কমে ৯ ভাগ হওয়ার চরম দৃষ্টান্ত, সংখ্যালঘুদের সাথে লীগের রসিকতা ছাড়া কিছু নয়। এর গোড়া কোথায়? নিশ্চয়ই এখানে কোনো সমস্যা আছে। সুতরাং কথায় কথায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, কাজে দাঙ্গাহাঙ্গামা, এক হাতে আগুন লাগাও, অন্য হাতে সম্প্রীতির মলম আর সহনীয় নয়। বইয়ের হিসাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৪৫ ভাগ বেদখল জমি, যা বাংলাদেশের ৫.৫ ভাগ জমির সমান, অধিকাংশই দু’টি বড় দলের পেটে। বুঝলাম জোট সরকার খারাপ; কিন্তু আওয়ামী লীগ কেন লাখ লাখ একর দখলি জমির এক একরও ফেরত দিলো না! লুটেরা কখনো বন্ধু হয়?

মৌলিক অধিকার হরণ এবং ভলতেয়ার
মোটেও যা কাম্য নয়। একজন সংখ্যালঘুর ওপর আঘাত মানেই সব সংখ্যালঘুর ওপর আঘাত। অপারেশন আর আক্রমণ, ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, কুপ্রবৃত্তি ক্যাশ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার যে অপরাজনীতি, এরপরও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদাসীনতায় আমি শঙ্কিত। আর বিশেষ একটি দল যখন এটাকে ক্যাশ করে বারবারই ‘চেক’ বিতরণের মতো ঘৃণার উদ্রেক ঘটায়, চুপ থাকা কঠিন। একই দৃশ্য দেখেছি বৌদ্ধবিহার ও মালোপাড়ায়। কে বলেছে ‘চেক’ দিলেই ‘সংখ্যালঘু অসুখ’ ভালো হয়ে যায়? ‘সংখ্যালঘু’ শব্দের এরা কী বোঝে? কী জানে? এরা তো সবখানেই রাজনীতির দুর্গন্ধ খোঁজে। ড. কিং বলেছেন, ‘অত্যাচারীকে সুযোগ দিলে সে তার অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়।’ আমি কোনো প-বিপ বুঝি না, বুঝি নিঃশর্ত মানবাধিকার। সুতরাং যারাই আমার সমালোচনা করেন, বলছি, কোথায় লিখি সেটা নয় বরং কী লিখি সেটাই বিষয়। ভলতেয়ারের উক্তি মনে নেই? ‘অন্যের বাকস্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন দেয়া উচিত।’
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় কিছু মিডিয়া বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো মন্ত্রী, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ‘কেষ্ট বেটা’Ñ একটাও গ্রেফতার হলো? সুতরাং যা আছে ৯৯ শতাংশ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। জামায়াত-শিবিরকে সন্ত্রাসী দেখিয়ে নিজেদের সন্ত্রাস অব্যাহত রাখার মূলে, একদলীয় শাসন ভুলিয়ে দেয়া। গোয়েবলসও ভুলিয়ে দিতো। আমাদের আশঙ্কা, একদলীয় শাসনের দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ… সংস্করণ চলতে পারে ২০৪১ সাল পেরিয়ে। আর তখন লাহোরের শিখদের অবস্থা হতে পারে সংখ্যালঘুদের।

কেস স্টাডিÑ সুচিত্রা সেন এবং অন্য বিতর্ক
মিডিয়ার সমস্যা, তাৎণিক বিষয়ে হামলে পড়া, যেমন সাগর-রুনি ও রানা প্লাজা। এরপর হাওয়া। জামায়াতের দখলে সুচিত্রার বাড়ি, বুঝলাম বিষয়টি ভয়ানক; কিন্তু কেউ কি গোড়া খোঁজে? আসুন গোড়ায় খুঁজি। সুচিত্রার বাবা ছিলেন ডাকবিভাগের কর্মচারী, যাকে কেউ জোর করে দেশ থেকে বের করে দেয়নি, ঘরেও আগুন দেয়নি, বরং কোনো কারণ ছাড়াই বাড়িটিকে জেলা প্রশাসকের কাছে ভাড়া দিয়ে সপরিবারে কলকাতায় চলে গেলেন ভদ্রলোক, যেমন গেছেন আরো লাখ লাখ ভদ্রলোক। এরপর তিনি আর কখনোই বসতভিটার খবর নেননি, যেমন নেননি আরো লাখ লাখ ভদ্রলোক। ফলে বিভিন্ন সরকারের আমলে শত্র“সম্পত্তি থেকে অর্পিত সম্পত্তিতে রূপান্তরিত বাড়িটি নানান দলের হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের হাতে। যেমন করে ২৬ লাখ একরের ৮৬ ভাগ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির হাতে। দোষটা তাহলে কার? সুচিত্রা, সুনীল গাঙ্গুলী, জ্যোতি বসু, শীর্ষেন্দু, মিঠুন চক্রবর্তী, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত, মৃণাল সেন… দোষ লাখ লাখ দেশত্যাগীর, বেশির ভাগই যারা স্বার্থপরের মতো সময় না দিয়েই পালিয়ে গেছেন। মাতৃভূমিকে অনেকেই ময়লা কাপড়ের মতো ছুড়ে ফেলেছেন। ১৯৭২ সালে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ‘ইদি আমিন’ মাত্র ৭২ ঘণ্টার নোটিশে সব ভারতীয় ও পাকিস্তানিকে দেশ থেকে বের করে দিলেন। এর কারণ, ১৮০০ শতাব্দী থেকে উগান্ডায় থাকলেও দেশটাকে তারা মাতৃভূমির বদলে ব্যবহার করত উপনিবেশের মতো। যুক্তির খাতিরে বলা যায়, এপারের সংখ্যালঘুদের ভাগ্য ভালো যে, কিছু কিছু েেত্র এরাও একই কাণ্ড করা সত্ত্বেও উগান্ডার ভাগ্য বহন করতে হয়নি। বলতে চাইছি, সংখ্যালঘু বিষয়টি বহুমাত্রিক, দায় একা জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপিয়ে ভুল করছে সরকার। মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ৯৯ ভাগ আঙুলই অন্যদের দিকে।
জুজুর ভয় দেখিয়ে লাভ আছে? ‘জামায়াত’ কিংবা ‘মওদুদকে’ ভূমিদস্যু বানানোই সমাধান নয়। বরং প্রফেসর বারাকাতের বইটি নিষিদ্ধ না করে সরকার স্বীকার করল, বয়সে অগ্রজ দলটির ভূমিদস্যুরাই পরে অন্য দলগুলোকে ভূমিদস্যু হতে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। বিষের এক ফোঁটা আর ১০০ ফোঁটা সবই বিষ। ’৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে অর্পিত সম্পত্তি দখলের ময়লা ঘাটলে হার্টঅ্যাটাকের অবস্থা হবে। হলমার্কের গুণ্ডা তানভীরের মতো হাজার হাজার তানভীরের দখলে লাখ লাখ একর খাস জমির গভীরে যাওয়া বিপজ্জনক। তবে ’৪৭ পরবর্তী পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখলে যখন একদলের চেয়ে আরেক দল এগিয়ে তখন হিন্দুদের অবস্থা পুরনো দিনের গানটির মতো, ‘আমারই বধূয়া আনবাড়ি যায় আমারই আঙ্গিনা দিয়া’ অর্থাৎ সোকলড অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকেই নিজেদের জমিতে নিজেরাই ভাড়া থাকতে বাধ্য।

১০ বনাম ৯ ভাগ
অদ্ভুত ঘটনা বটে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রধান খোরাক হিন্দু ভোট! অথচ ভোটকেন্দ্রে জ্বালাও-পোড়াও, ছিনতাই, সিলমারা কে বা কারা করল সরকার তা জানতে চায় না। তাদের চোখে সব দোষ ওই কেষ্ট বেটার! ৫ জানুয়ানি নির্বাচনে সরকারের উদাম সংখ্যালঘুনির্ভরতা শুধু সাম্প্রদায়িকই নয়, ভোটসন্ত্রাসীও। মিডিয়ায় খবর, ওদের ধরে নিয়ে গেছে কিংবা বাধ্য করেছে। চালাকির রাজনীতি ধোপে টেকে না, মানুষ কি এত বোকা? সুতরাং প্রণবকেই বলতে হবে, ভারতে যদি শুধু সংখ্যালঘুদের ভোটে নির্বাচন কবুল হয়, আমাদের নির্বাচনও কবুল। বিলাতি গোমড় ফাঁস। ‘৬০-এর দশক থেকে যেভাবে দিল্লি সরকার তাদের হাজার হাজার মাওবাদী আর ইসলামিক সংগঠনগুলোর সদস্যদের হত্যা করে সন্ত্রাস দমনের নামে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতাকামী কাশ্মিরি এবং অসমিয়াদেরই হত্যা করছে বলে অভিযোগ, একই টেকনিক তারা এ দেশেও চালু করেছে।’ অর্থাৎ দু’টি গোষ্ঠীর মধ্যে কলহ বাধিয়ে দিয়ে ভুলিয়ে দিতে পেরেছেÑ হলমার্ক, পদ্মা সেতু, শেয়ারবাজার ও চুরির নির্বাচনের মতো সরকার নড়িয়ে দেয়া দুর্নীতি। অন্যথায় গণ-অভ্যুত্থান হতো। ড. কিং বলেছেন, ‘ফেরাউনের কাজই ছিল কৃতদাসদের মধ্যে সর্বণ ঝগড়া বাধিয়ে রাখা, যেন নির্যাতন নিয়ে তারা মাথা না ঘামায়… কৃতদাসেরা যখন এক হয়েছে, শুধু তখনি এদের কোমর থেকে নামলো শ্বেতাঙ্গরা।’ এর কোনো লণ এখন পর্যন্ত না দেখলেও তৃতীয় মতের অভিযোগ, এই দাগে ৯ আর ১০ ভাগের খেলায় দারুণ সফল বিশ্বের দুই নম্বর শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থাটি। শুরু হলো সেকেন্ড রাউন্ড, চলবে পাঁচ বছর। জ্বলবে অনেক। মরবে অসংখ্য। তখনো সাম্প্রদায়িক ইস্যুই হতে পারে প্রধান হাতিয়ার। জ্বালাওপোড়াও, ধর্ষণ, যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে তখনো দোষ হবে কেষ্ট বেটাদেরই।

কার কী ত্র“টি
Ñ বারাকাতের বইটি নিষিদ্ধ না করে সরকার স্বীকার করল, তাদের দলের বিশাল একটি অংশ হাজার হাজার কোটি টাকার অর্পিত সম্পত্তির মালিক।
Ñ বইতে প্রমাণ মিলেছে, হিন্দুরা যদি এই হারে দেশত্যাগ না করত তাহলে ৪২ ভাগ কমে ৯ ভাগ হতো না অথবা করেছে বলেই হয়েছে।
Ñ পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে পরিমাণ মাইগ্রেশন হয়েছে তার সাথে সাম্প্রদায়িক গণ্ডগোলের পরিসংখ্যানের সরাসরি সম্পর্ক কম এবং সুবিধাবাদী মাইগ্রেশনই বেশি। তবে আনুপাতিক হারে মাইগ্রেশনের হার ’৭১ পরবর্তী প্রতিটি সরকারের আমলেই কমার বদলে বরং বেড়েছে। এ দেশে সংখ্যালঘুদের হার ১৯৬১ সালে ১৭.৩ ভাগ থেকে কমে ১৯৮১ সালে ১২.৪ ভাগ, ১৯৯১ সালে ১১ ভাগ থেকে ২০০১ সালে ১০.৫ ভাগ। দেশ গণতান্ত্রিক হলেও সংখ্যালঘুদের ভাগ্য স্বৈরাচার আমলের অপরিবর্তিত মতোই অপরিবর্তিত! অর্থাৎ বারাকাতের মতে, ১০.৫ ভাগ হওয়া উচিত ছিল ১৯.৫ ভাগ। ভাবা যায়?
Ñ পরের সম্পত্তি যেই দখল করে তার নাম লুটেরা। সুতরাং ধর্মনিরপে ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার ক্রুসেডে যেহেতু শেখ হাসিনাই এগিয়ে সেহেতু কলঙ্ক তিলক জামায়াত-বিএনপির চেয়ে তাদেরই বেশি।
Ñ দলের সাইজ অনুযায়ী খেয়েছে। যেমন জামায়াত ও জাতীয় পার্টি ছোট দল বলে খেয়েছে ১৪%, বাকি ৮৬% খেয়েছে বড় দু’টি দলের সাইজ অনুযায়ী।
Ñ পরিসংখ্যান অনুযায়ী আওয়ামী লীগের আর কখনোই অন্য দলকে চোর-ডাকাত বলা উচিত হবে না। কারণ, চিত হয়ে থুথু ফেললে নিজের বুকেই পড়ে।
Ñ প্রতিটি দেশেই ভিন্ন ধর্মের মানুষ থাকলেও শুধু বাংলাদেশেই দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বারবার দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণ এবং সমাধান খুঁজে দেখার পে কেউই আগ্রহী নয়। বরং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা জাগিয়ে রেখে মতাই আসল। হেটক্রাইমের পর যাদের থাকার কথা জেলে, তারাই মতায় দাপিয়ে বেড়ায়।
Ñ ওরা যদি চলে না গিয়ে সংগ্রাম করে অধিকার আদায় করত, সমাজ ও রাজনীতিতে এদের যথাযথ প্রভাব ও প্রতিনিধিত্ব থাকত, ফলে উভয়প উভয়পরে সম্পূরক হতো। সমাজের ভারসাম্য ইতিবাচক হতো। ইতিহাস বলে, এভাবেই হওয়া উচিত। ’৭১ পূর্ববর্তী সময়ে যুদ্ধ-দাঙ্গা হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল। ভিন্ন ধর্মীরা তখন রক্তাক্ত করার বদলে রা করতেই ভালোবাসত, স্থানীয় প্রশাসনও সাহায্য করত, এখন সে কথা বলতে পারি কি?
Ñ তথ্য অনুযায়ী ২৬ লাখ একর অর্পিত সম্পত্তি (সরকারি কিংবা বেসরকারি) ভণ না করে বরং গৃহহীন এবং ভূমিহীনদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া যেত। এতে গরিবদের উপকার হতো, বিতর্ক কমত। উদাহরণস্বরূপ রাজধানীর ৪৮.৪ ভাগ বস্তিবাসীর ভয়ঙ্কর ইতর জীবন কিছু দিয়েই ঢাকা যাবে না। গরিবদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার সম্ভব না। অন্য দল না দিলেও বন্ধু দলের জন্য ফিরিয়ে না দেয়াটা শোভন নয়।
Ñ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ’৭১-এর পর এমন কী ঘটল যে জন্য দেশত্যাগীদের হার কমার বদলে বাড়ল! বুঝলাম সামরিক সরকার খারাপ; কিন্তু ’৭১ তো এসেছিল অসাম্প্রদায়িক আর ধর্মনিরপেতার চেতনা নিয়ে, যা ৪৭-এর বিপরীত; কিন্তু কী হলো? ৪৩ বছরে ৮৫ ভাগ সংখ্যালঘু কমা কিংবা বেড়ে চার গুণ না হওয়ার পেছনে সবটাই কি দেশপ্রেমহীনতা নাকি কুরাজনীতি? সংখ্যালঘুজনিত হেটক্রাইমের বিচার হয় না কেন? হেটক্রাইমের উদ্যোক্তা কারা? দেশত্যাগের সাথে অর্পিত সম্পত্তির সম্পর্ক কী? ভূমি দখলই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে হেটক্রাইমের বিচার হয়নি কেন?
Ñ নির্যাতিত কৃষ্ণাঙ্গরা ৬০০ বছর ধরে অত্যাচার ভোগ করলেও কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকার আদায় করায় আজ একজন অর্ধকৃষ্ণাঙ্গ হোয়াইট হাউজে। বরং এই কাজটি না করে অসুস্থ রাজনীতির অংশ সৃষ্টিতে নিয়ামক হয়েছে সংখ্যালঘুরা। এরা তাদের পূর্বপুরুষের হাজার বছরের ভিটা-মাটির সাথেও বেঈমানি করেছে। ভোটব্যাংকের কলঙ্কতিলক পরেছে কপালে। লেজুরবৃত্তিতে বদনামী কায়েম করেছে। এখন না ঘরকা না ঘাটকা।
Ñ বৌদ্ধবিহার ও মালোপাড়ার ঘটনায় প্রমাণ হলো, কেঁচো সম্প্রদায়ের দুর্ভাগ্যের জন্য অধিক দায়ী তারাই। এরা আত্মবিশ্বাসহীন পরগাছা। হামলা হলে, সংখ্যালঘুদের মানববন্ধনে হাসব না কাঁদব! কারো এক্টিভিজম থেকেই শিা নেয়নি কেঁচো সম্প্রদায়। তাই তো এদের তাড়িয়ে দেয়া এত সহজ। এই দফায় এত প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির, এত মূর্তি ভাঙা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের চেক আর ছেলে ভোলানো কথায় সব ভুলে গেল! এর চেয়ে লজ্জার আর কী! (চিন্তা নেই আমি নিজেও কাল্পনিক কেঁচো সম্প্রদায়ের সদস্য)।
Ñ অন্যায় যে করে কিংবা যে প্ররোচিত করে, দুইজনই অপরাধী। বইয়ের তথ্য এবং আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়, মাইগ্রেশন করে তারা যেমন খারাপ করেছে, তেমনিই এর বিরূপ প্রভাব অন্যদের অপরাধে উৎসাহিত করেছে। অর্থাৎ অর্পিত সম্পদ সৃষ্টি এবং দখলকারী উভয়ই খারাপ।
Ñ জ্বালাও-পোড়াওয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বদলে ভর্তুকির চেক গ্রহণ করে আবারো প্রমাণ করল এরা সত্যিই কেঁচো সম্প্রদায়।
Ñ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। দুঃখ প্রকাশ, চেক গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় সান্ত্বনা, রাজনৈতিক দোষারোপ দিয়ে সংখ্যালঘু অসুখ সারবে? বরং কুরুপাণ্ডব ও রাম-রাবনের যুদ্ধ হিন্দু ধর্মেরই অংশ। তারা হিন্দু ধর্মের এক্টিভিজম থেকে শিা নেয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ্যাটম বোমা তৈরির জন্য ‘ম্যানহাটন প্রজেক্টের’ পরিচালক বিজ্ঞানী ‘ওপেনহেইমার’ প্রয়োজনীয় নৈতিক সমর্থন পেয়েছিলেন ভগবদগীতায়, যার বিস্তারিত ইন্টারনেটে। আমার ধর্মভীরু বাবাকে দেখেছি, এক দিকে পূঁজাপার্বণ, অন্য দিকে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। ’৬৫-এর যুদ্ধ তহবিলে বিশাল অঙ্ক দান করার বিনিময়ে গ্রেফতার থেকে বাঁচিয়ে দিলেন স্থানীয় সংখ্যালঘুদের। ’৭১-এ স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে দিনরাত মুসাবিদার পর বিশাল অঙ্কের বিনিময়ে প্রায় ১০ হাজার হিন্দুর জীবন রা করলেন। যা বলতে চাইছি, ধর্ম ও এক্টিভিজম, একসূত্রে গাঁথা। বাঁচতে হলে কোমর সোজা রেখে দুটোই চালাতে হবে। অর্থাৎ সামরিক আমলেও ওনারা কোমর সোজা রেখে মাথা উঁচু করেই থাকতেন। তাহলে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যালঘুরা সেই তুলনায় দুর্বল না অরতি!
Ñ ১৯৬৪-৭১ দিনে ৭০৫ জন। ১৯৭১-৮১ দিনে ৫২১ জন। ১৯৮১-৯১ দিনে ৪৩৮ জন। ১৯৯১-২০০১ দিনে ৭৬৭ জন। বারাকাতের বইয়ের পরিসংখ্যান যদি সত্য হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক সরকারগুলো মাইগ্রেশন কমাতে ব্যর্থ বরং আইয়ুব আমলের সাথে প্রায় হুবহু। অন্য দিকে জিয়া-এরশাদের আমলে মাইগ্রেশন প্রায় অর্ধেক।
Ñ সরকার যদি হাজার হাজার ক্রসফায়ারও করে তারপরও মানুষ এই নির্বাচন গ্রহণ করবে না। আর এই অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় লাহোরের শিখদের পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে সংখ্যালঘুদের।
Ñ এপারের সংখ্যালঘুরা যখন একটি দলের নিয়মিত ভোটব্যাংক তখন ওপারের সংখ্যালঘুরা সব দলের সাথে দরকষাকষি ঠিক হলেই ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়।

কেন এই বৈপীরত্য
Ñ ১৯৬১ সালের ভারতীয় আদমশুমারির তথ্য Ñ
১৯৬১ সালে ভারতীয় সংখ্যালঘুদের হার ১০.৭%, ১৯৭১-এ ১১.২%, ১৯৮১-এ ১১.৪%, ১৯৯১-এ ১১.৭%, ২০০১ সালে ১৩.৪% অর্থাৎ সংখ্যা প্রতিবারই বেড়েছে। তবে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এই তথ্য না থাকার পেছনে সামনের নির্বাচনকেই সন্দেহ করা হয়েছে।
Ñ ২০১৩ সালে ইকোনোমিস্টের তথ্য অনুযায়ী ১২৭ কোটি জনসংখ্যার ১৭ কোটি ৭০ লাখ মুসলিম, যা ১৪.৬ ভাগ। ভারতীয় মুসলিমদের দাবি, সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
Ñ বৃদ্ধির হার সংখ্যালঘুদেরই বেশি। ১৯৬১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩১ থেকে বেড়ে ৩৫। ২০০১-এর আদমশুমারিতে সংখ্যাগুরুদের বৃদ্ধির হার ২০.৩ বনাম সংখ্যালঘুদের ২৯.৫।
Ñ ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের’ হিসাবে ৬৭ বছরে পাকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ ভাগ বাড়ায় মুসলিম স্কলারদের দাবি ভারতীয় সংখ্যালঘুদের সংখ্যাও বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণ। একইভাবে এই ভূখণ্ডেরও প্রায় ৪.৫ কোটি মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ১৫ কোটি হওয়ায় তাদের বিতর্ক সমর্থনযোগ্য। পাশাপাশি এটাও লণীয়, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগ করলেও ৭১-এর পর এদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৬ ভাগ থেকে কমে ৯ ভাগ। এরপরও যারা ধর্মনিরপে আর অসাম্প্রদায়িকতার নামে রাজনীতি করেন, তারা শুধু অপদার্থই নন, মানবতার জন্যও হুমকি। বরাবরই আওয়ামী সরকার এই দাবিটি করে এসেছে।
Ñ শেখ হাসিনার খাতায় পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। সুতরাং তারা বাদ; কিন্তু ধর্মনিরপে ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুরা কিভাবে বাড়ার বদলে কমে ১৯৬১-এর পর্যায়ে গেলো! সাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টিতে নয় বরং এগুল ভাবতে হবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের নিরিখে। ‘শুধু ভারতকে নিরাপদ রাখাই কি একটি সফল রাষ্ট্রের একমাত্র পরিচয়? ভারতীয়দের বাঁচিয়ে রাখতে এ দেশের মানুষকে গুলি খেয়ে মরতে হবে কেন? এ কেমন আবদার সুজাতার?’ সুতরাং দুটো প্রস্তাব : ১) ভারত-বাংলাদেশ সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি করে ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা। ২) ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে হেটক্রাইমের জন্য রিটায়ার্ড জাজদের সমন্বয়ে ট্রুথ কমিশন গঠন করে সত্য উদ্ঘাটন ও বিচার। অন্যথায় রাষ্ট্রনীতিকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করলে সেটা প্রোপাগান্ডার শামিল।
Ñ দেশ বিভাগ থেকে শিা না নিয়ে যৌথবাহিনীর দুয়ারে সমস্যার সমাধান নেই। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে ভারতীয় মুসলমানদের হার আট থেকে বেড়ে যখন ১০ ভাগ, ব্যাপক মাইগ্রেশনের পরও এপারের সংখ্যালঘুদের সংখ্যা তখনো ২৫ ভাগ। ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত ভারতের জন্যসংখ্যা ৩৮০ মিলিয়নের সাড়ে ২৫ কোটি হিন্দু, ৯ কোটি ২০ লাখ মুসলমান, ছয় লাখ শিখ। ৬৭ বছরে তিন দেশের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় চার গুণ; কিন্তু ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতি ইতিবাচক হয়নি বলেই ১ কোটি ১৪ লাখ কমে ১ কোটি। উল্টোটা হলে ২০১৪ সালে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারত ৩ কোটির বেশি। কিংবা ’৪৭ পরবর্তী পরিস্থিতি বিধ্বস্ত না হলে ভারতীয় মুসলমানদের মতো এদের সংখ্যাও বেড়ে আজ কত মিলিয়ন হতো তা অনুমান করা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায় ৯ কোটি ২০ লাখ মিলিয়ন ভারতীয় সংখ্যালঘুরা ৬৭ বছরে ৩০ কোটি পেরিয়ে।
Ñ মুক্তিযুদ্ধের মিউজিয়াম ও প্রচারণাও এখন ভরাপেটে ভাজা মাছের অবস্থা। হলোকাস্টের মিউজিয়াম দুনিয়াজুড়ে; কিন্তু বিশ্বের সর্ববৃহৎ মানবিক দুর্যোগের জন্য রিসার্চ সেন্টার বা মিউজিয়াম থাকলে এই মাপের দাঙ্গা-হাঙ্গামা হতো কি? অতীতের বীভৎস্যতা স্মরণ করিয়ে দিতে ‘মাইগ্রেশন মিউজিয়াম’ অতি জরুরি।

সবশেষে
Ñ দণি আফ্রিকার মতো আমরাও কেন দলমত নির্বিশেষে ১৬ কোটি মানুষ অন্তত একবার সব বিভক্তি দূরে রেখে শান্তিপূর্ণ বসবাসের চেষ্টা করে দেখব না! ‘সবকিছুই এই মুহূর্তে, এখনই আজই করতে হবে কেন?’ না করলে কী হবে? প্রথম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি একদিন বা এক বছরের প্রক্রিয়া? যুদ্ধ কিংবা শান্তি কোনোটাই ঘড়ির কাঁটা ধরে আসে না। এলে পরিণাম ভয়াবহ। রাজনীতি স্থায়ী; কিন্তু রাজনীতিকেরা নয়। সুতরাং তাড়াহুড়ো করে কোনো ভুল হয়ে গেলে শোধরানো যাবে না। ভাবুন, ঠাণ্ডা মাথায়।
দ্রষ্টব্য : লেখাটি অ্যাক্টিভিজমের ভিত্তিতে।
নিউ ইয়র্ক প্রবাসী, কালামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী

 

 

 

 

 

 

VN:F [1.9.22_1171]
Rating: 0.0/10 (0 votes cast)
VN:F [1.9.22_1171]
Rating: 0 (from 0 votes)